মিরাজ হোসেন বশেফমুবিপ্রবি প্রতিনিধি:
উপাচার্যের খাস কামরায় ছাত্র আন্দোলনের পক্ষে শিক্ষকের স্টাটাসের স্ক্রিনশট
'আমার ছাত্র মরলো কেনো? জবাব চাই, বিচার চাই...' — নিজের ফেসবুক অ্যাকাউন্টে কোটা সংস্কার আন্দোলনকে ঘিরে ছাত্রহত্যার ঘটনায় বিচার চেয়ে এই পোস্টটি করেছিলেন জামালপুরের বঙ্গমাতা শেখ ফজিলাতুন্নেছা মুজিব বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ফিশারিজ বিভাগের সহকারী অধ্যাপক মো. সাইফুল ইসলাম।
আর এতেই যেন গা চমচমিয়ে উঠলো পদত্যাগী স্বৈরাচার সরকারের সময় এ বিশ্ববিদ্যালয়ে নিয়োগ পাওয়া শিক্ষক, কর্মকর্তা, কর্মচারীসহ ছাত্রলীগ শাখার নেতাদের। তারা পোস্টদাতা সাইফুল ইসলামসহ যারা কমেন্ট করেছেন তাদের সেইসব পোস্টের স্ক্রিনশট প্রিন্ট করে জমা দিয়েছেন পদত্যাগী উপাচার্য মো. কামরুল আলম খানের কাছে। শুধু সাইফুল ইসলাম-ই নন, আরও সাবেক ট্রেজারার, কয়েকজন শিক্ষকের স্ট্যাটাস ও কমেন্টের স্ক্রিনশট জমা দিয়েছেন তারা।
ক্যাম্পাস সূত্র জানায়, গত জুলাই মাসে সরকারি চাকরিতে কোটা সংস্কারকে কেন্দ্রে করে শুরু হয় বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন। এতে শত শত ছাত্র-জনতা নিহত হতে থাকলে তা রূপ নেয় সরকার পতনের গণঅভ্যুত্থানে। অন্যান্য বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের মতো এ বিশ্ববিদ্যালয়েরও কিছু শিক্ষক আন্দোলনের যৌক্তিকতা তুলে ধরে এর পক্ষে ফেসবুকে পোস্ট করেন। এসব ঘটনায় নজরদারি বা বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়ার উদ্দেশ্যে সাবেক উপাচার্যের কাছে এসব জমা দেওয়া হয়। যা উপাচার্য চলে যাওয়ার পর তার কক্ষ পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন করতে গিয়ে তা পাওয়া যায়। তবে কে বা কারা এসব স্ক্রিনশট জমা দিয়েছেন তা জানা যায়নি।
খামেভর্তি ১০ পাতার প্রিন্ট করা পোস্ট ও কমেন্টের বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, বেশির ভাগ পোস্টই সাইফুল ইসলামের। হাত উঁচু করে লাল কার্ড দেখানো একটি ছবি সংযুক্ত করে আরেকটি পোস্টে তিনি লেখেন, 'ছাত্র-জনতা মুক্তি পাক, খুনীরা সব নিপাত যাক।' এছাড়াও অন্যান্য পোস্টগুলোতেও আন্দোলনের পক্ষে তার স্পষ্ট অবস্থান ফুটে ওঠে।
ফিশারিজ বিভাগের সহকারী অধ্যাপক সৈয়দ আরিফুল হকের স্ট্যাটাস শেয়ারের কপিও আছে। পোস্টগুলোর মধ্যে একটি পোস্টে কোরআনের আয়াত এবং আরেকটিতে শহিদ আবু সাঈদের মৃত্যুর শোক প্রকাশ করে লেখেন, 'আমরা শিক্ষকরা, যারা ছাত্র-ছাত্রীদের কাছে অভিভাবক হিসেবে পরিচিত সে শিক্ষকরাই যখন নিজ ক্যম্পাসে শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা দিতে ব্যর্থ, সে আবার কিসের অভিভাবক। এ লজ্জা আমাদের, মেরুদণ্ডহীন শিক্ষকদের। আমি শিক্ষক হিসেবে বাকরুদ্ধ, লজ্জিত,ব্যথিত।'
এছাড়া কমেন্টে সমাজকর্মবিভাগের শিক্ষক ড. আল মামুন সরকার ও ট্রেজারার মোহাম্মদ আবদুল মাননানের নাম হাইলাইটার পেন দিয়ে মার্ক করা রয়েছে। এতে কিছু শিক্ষার্থীর কমেন্টও দেখা যায়। তারা হলেন- বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক শিক্ষার্থী শাকিল আহমেদ, বর্তমান শিক্ষার্থী তাবাসসুম রাফি ও মামুনুর রশিদসহ আরও বেশ কয়েকজন।
ক্যাম্পাস সংশ্লিষ্টদের ধারণা, ৪ আগস্ট ছিলো অভ্যুত্থানের আগে সর্বশেষ কর্মদিবস। ওইদিনই এসব স্ক্রিনশট উপাচার্যের কাছে জমা দেওয়া হয়েছে। স্ক্রিনশট অনুযায়ী, সাইফুল ইসলামের সর্বশেষ স্ট্যাটাস ৩ আগস্ট দেওয়া। যা পোস্ট করার ১৯ ঘণ্টা স্ক্রিনশট নেওয়া হয়েছে। অন্যান্য স্ক্রিনশটগুলোতেও দেখা যায়, বেশিরভাগ পোস্ট করা হয়েছে ৩ আগস্ট বা তারও আগে।
ক্যাম্পাস সূত্র জানায়, ৪ আগস্ট ছিলো রোববার। ওইদিন সকালে উপাচার্য ঢাকা থেকে ক্যাম্পাসে আসেন। এরপর থেকে তার কক্ষে সদ্য পদত্যাগী ভারপ্রাপ্ত প্রক্টর এসএম ইউসুফ আলী, মির্জা আজম হলের ভারপ্রাপ্ত প্রভোস্ট পার্থ সারথি দাশ, ছাত্রলীগের আহ্বায়ক কাওসার আহমেদ স্বাধীন, যুগ্ম আহ্বায়ক তাইফুল ইসলাম পলাশসহ কয়েকজন শিক্ষক ও কর্মকর্তা উপাচার্যের কাছে বসেছিলেন। আর কক্ষটি ৫ আগস্টের পর ২৯ সেপ্টেম্বর খোলা হয় । এরপরই মূলত এসব স্ক্রিনশট পাওয়া গেছে। আন্দোলন চলাকালে ছাত্রলীগ সাধারণ শিক্ষার্থীদের নানাভাবে হয়রানি করেছে। অনেক কর্মকর্তা ও কর্মচারীর মোবাইল চেক করেছে। আর এসব কাজে সহায়তা দিয়ে গেছেন পদত্যাগী উপাচার্য, ভারপ্রাপ্ত প্রক্টরসহ প্রশাসনের অনেক শিক্ষক ও কর্মকর্তা।
এ বিষয়ে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন জানান, উর্ধ্বতনরা নির্দেশ দিয়েছেন, সরকার যেকোনো সময় উপাচার্য নিয়োগ দিতে পারে। তাই কক্ষটি নতুন উপাচার্যের ব্যবহারের উপযোগী করতে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন করে রাখতে। এছাড়া সদ্য পদত্যাগ করা উপাচার্যের ব্যক্তিগত কিছু জিনিসপত্র ছিল। তাও ফেরত পাটাতে বলা হয়। আর এসব গোছাতে গিয়ে উপাচার্যের খাস কামরায় কয়েকটি খাম পাওয়া যায়। এর বেশিরভাগই নষ্ট কাগজপত্র। সেখানে পাওয়া একটি খাম খুললে একজন শিক্ষকদের ফেসবুক পোস্ট ও কমেন্টের স্ক্রিনশট প্রিন্ট করে মার্কার দিয়ে মার্ক করা দেখতে পাওয়া যায়। তখন বিষয়টি অফিসের ঊর্ধ্বতনদের জানানো হয়।
তবে এ বিষয় যোগাযোগ করা হলে সদ্য পদত্যাগ করা উপাচার্য অধ্যাপক ড. মো: কামরুল আলম খানের সঙ্গে কথা বলা সম্ভব হয়নি।
এদিকে সরকার গত ২৫ সেপ্টেম্বর ফিশারিজ বিভাগের সহকারী অধ্যাপক মো. সাইফুল ইসলামকে বিশ্ববিদ্যালয়ের আর্থিক, প্রশাসনিক ও একাডেমিক দায়িত্বে নিয়োজিত করেছে সরকার। এ বিষয়ে তার সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি সাংবাদিকদের বলেন, গত ৮ অক্টোবর উপাচার্যের কক্ষ পরিষ্কার করার সময় একটি খাম পাওয়া যায়। খামটিতে জুলাই-আগস্ট মাসে ছাত্র আন্দোলন নিয়ে শিক্ষকদের করা কয়েকটি পোস্টের স্ক্রিনশট পাওয়া যায়। সেগুলোতে শিক্ষকদের নাম হাইলাইট করা।
'ঘটনাটি অত্যন্ত দুঃখজনক এবং রাজনৈতিক প্রতিহিংসার বর্হিঃপ্রকাশ। দাবিটি ছিলো যৌক্তিক। শিক্ষক হিসেবে ছাত্রদের পক্ষে অবস্থান নেওয়াও স্বাভাবিক। তাছাড়া এটি মতপ্রকাশের অধিকারও বটে। কিন্তু গোপনে এ ধরনের নজরদারি কিংবা অভিযোগ খুবই অনিভিপ্রেত।'
তিনি করেন, কোনো ধরনের ক্ষতি সাধনের উদ্দেশ্যেই এই হীন কাজটি কেউ না কেউ করেছে। এই আন্দোলন সফল না হলে যেমন অনেক শিক্ষার্থীর শিক্ষাজীবন চালিয়ে নেওয়া সম্ভব হতো না এবং তেমনই যেসব শিক্ষক, কর্মকর্তা ও কর্মচারী অনলাইন বা অফলাইনে আন্দোলনে সমর্থন দিয়েছে তাদেরও হয়রানির মধ্যে পড়তে হতো। আমরা মনে করি- এর প্রক্রিয়া হিসেবেই এসব করা হয়েছ।
নিয়মিত উপাচার্য নিয়োগ দেওয়া হলে বিষয়টি নিয়ে তদন্ত করে জড়িতদের বিরুদ্ধে যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানানো হবে বলেও জানান মো. সাইফুল ইসলাম।
0 coment rios: